
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের সময় সংরক্ষিত বনাঞ্চলসহ পাহাড় থেকে কাটা হয় প্রায় আড়াই লাখ গাছ। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে একটি গাছের বিপরীতে তিনটি করে চারা রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রেলপথের দুই পাশে সাত লাখ ২০ হাজার গাছের চারা লাগানো হয়েছে। তবে এসব চারার বড় অংশই আকাশমণি। দ্রুত বর্ধনশীল এই গাছ এখন বন, বন্যপ্রাণী, পরিবেশ ও মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রেলপথের দুই পাশে শিমুল, পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, ছাতিম ও সোনালুসহ বিভিন্ন বনজ ও ফলদ গাছ লাগানোর কথা ছিল। এসব গাছ বন্যপ্রাণী ও পাখির খাবারের জোগান দেওয়ার পাশাপাশি রেলযাত্রায় নান্দনিকতা বাড়াতে পারত। কিন্তু পরিচর্যার অভাবে অনেক প্রজাতির গাছ মারা গেলেও টিকে আছে লাখো আকাশমণি।
বন ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, আকাশমণি অতিরিক্ত পানি শোষণ করে মাটির নিচের পানির স্তর ও আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়। এতে আশপাশের অন্য গাছ, লতাগুল্ম ও উদ্ভিদ সহজে বেড়ে উঠতে পারে না। গাছটির পাতা মাটির উর্বরতা কমায়। পাশাপাশি মাত্র ১০ বছরের মধ্যে কাঠ পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদি বনাঞ্চল গড়ে তোলার জন্য এটি উপযোগী নয়।
চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০২ কিলোমিটার রেলপথের প্রায় ২৭ কিলোমিটার গেছে চুনতি ও ফাসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যানের মধ্য দিয়ে। রেলপথ নির্মাণে এসব এলাকায় আড়াই লাখের মতো গাছ কাটা পড়ে। রেলওয়ের লাগানো চারার দুই-তৃতীয়াংশই নষ্ট হয়ে গেছে। টিকে থাকা দুই লাখ ৬৭ হাজার গাছের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই আকাশমণি। অর্থাৎ টিকে থাকা আকাশমণির সংখ্যা লাখের কাছাকাছি। অথচ বন বিভাগের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, এসব গাছ ১০ বছর পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যার দায়িত্ব রেলওয়ের।
চকরিয়ার ডুলাহাজারা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের শাহারবিল থেকে পূর্ব বড় ভেওলা এবং মালুমঘাট থেকে ডুলারছড়া এলাকায় রেলপথের দুই পাশে সারি সারি আকাশমণি গাছ দেখা গেছে। প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় হাতেগোনা কয়েকটি অর্জুন, জাম, চালতা, জলপাই ও জারুলের চারা রয়েছে। এসব গাছের তুলনায় আকাশমণি অন্তত তিন গুণ বড় হয়ে উঠছে।
রেলওয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বন বিভাগের চাহিদা অনুযায়ী রেলপথ নির্মাণে ক্ষতিগ্রস্ত বনাঞ্চলের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চারাগুলো রোপণ করা হয়েছে। আকাশমণি দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং ডালপালা ছড়িয়ে অল্প সময়ে বনভূমির মতো পরিবেশ তৈরি করে—এ কারণেই এ গাছ বেছে নেওয়া হয়েছিল।
তবে গত বছরের ১৫ মে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণির চারা তৈরি, রোপণ ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়। রেলওয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, চারাগুলো লাগানোর সময় আকাশমণি রোপণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ছিল না।
বাংলাদেশ বন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ফুল ফোটার সময় আকাশমণি থেকে প্রচুর পুষ্পরেণু ছড়ায়। এসব পুষ্পরেণু মানুষের নাকের নাগালের মধ্যে থাকায় শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে অ্যালার্জি, রাইনাইটিস, আর্টিকারিয়া, একজিমা ও অ্যাজমাসহ বিভিন্ন সমস্যা তৈরি করতে পারে। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, গাছটি অতিরিক্ত পানি শোষণ করে মাটি শুষ্ক করে এবং এর নিচের উদ্ভিদ আচ্ছাদন নষ্ট করে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন বলেন, আকাশমণির কিছু নেতিবাচক দিক থাকলেও লবণাক্ত বা পতিত জমিতে এ গাছ লাগানো যেতে পারে। এর শিকড় মাটি ধরে রেখে ভাঙনরোধে সহায়তা করে এবং প্রতিকূল পরিবেশেও বেড়ে উঠতে পারে। তবে অন্যান্য প্রজাতির সঙ্গে সীমিতসংখ্যক আকাশমণি লাগানো গেলেও কক্সবাজার রেলপথের মতো একচেটিয়াভাবে এ গাছ রোপণ করা ঠিক হয়নি। দীর্ঘমেয়াদে বনাঞ্চল গড়ে তোলার জন্য এটি আদর্শ গাছ নয়।
বন সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা আরণ্যক ফাউন্ডেশনের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রাকৃতিক বনে আকাশমণি লাগানো উচিত নয়। এর বীজ পড়ে ঘন হয়ে চারা গজায়, যা বনের প্রতিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। পতিত জমিতে এ গাছ লাগানো যেতে পারে, কিন্তু প্রাকৃতিক গাছপালা ও ঝোপঝাড় কেটে আকাশমণি রোপণ করা উচিত নয়।